মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ০৫:১২ পূর্বাহ্ন

দুলাভাই-সিলেটের উন্নয়ন চাই

লেখক : কবি ও কলামিস্ট মিশিগান - আমেরিকা

 

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মানুষ কোন পথ বেছে নেবেন তা নিয়ে মহা সংকটে পড়েছেন। এই পথ বেছে নেওয়ার বিবেচনার উপর নির্ভর করবে একটি যথার্থ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পদক্ষেপ নিতে।

বাংলাদেশের মতো যেসব দেশ সংগ্রাম ও আত্মদানের মাধ্যমে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এই বিশ্বাস তাঁদের দৃঢ়। এদেশের মানুষ দুঃখ করতে পারে কিন্তু মরবে না। টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে জনগণের  দৃঢ়তাই চরম শক্তি। জনগণের লক্ষ্য  স্বনির্ভরতা।

বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন দেশবাসীকে উত্থানে জাগরণে এবং স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছে, তারপরে শেখ হাসিনা সরকার দেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। বাংলাদেশ দ্বিতীয়বার স্বাধীন হয়েছে। ছাত্র আন্দোলন সরাসরি জনগণের কল্যাণে নিবেদিত হয়।

তাতে কৃষক-শ্রমিক, লাঞ্ছিত-বঞ্চিত নিত্য খেটে খাওয়া মানুষ তথা আমজনতার জীবন-মরণ, আশা-আকাঙ্ক্ষা,  চাওয়া-পাওয়া, সংগ্রাম ও জয় ইত্যাদি প্রতিফলিত হয়েছে। একটি জাতির জন্য স্বাধীনতা অর্জন সবচেয়ে বড় কথা। সেই পাওয়া ও বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অমোঘ শক্তিতে সম্ভব হয়েছে, ত্বরান্বিত হয়েছে এদেশের বিজয় লাভ।

সম্মানিত পাঠক, মাফ করবেন। আজকের প্রসঙ্গ “দুলাভাই-সিলেটের উন্নয়ন চাই” নিয়ে লেখা হলেও এ প্রসঙ্গে কি ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে তা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। তার প্রেক্ষাপট বিশাল ও বিচিত্র। এখানে বলা বাহুল্য যে, আমরা সমাজে বসবাস করি। এ বসবাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, মৌলিক দিক-হলো মানুষে মানুষে সম্পর্ক। এর বৈচিত্রের শেষ নেই।  একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, এ সম্পর্কটি আবার সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে কে কিভাবে জীবিকা অর্জন করেছে এবং জীবন-যাপন ও উপভোগ করে তার ওপর। যেকোনো শ্রেণীবিভক্ত সমাজে এটা মূলত নির্ভর করে উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে কার কি সম্পর্ক তার ওপর। এই ভিত্তিতে সমাজ বিভক্ত থাকে মোট দাগে শোষক ও শোষিত শ্রেণীতে। বাংলাদেশে কালো টাকা ও সন্ত্রাসের কবল মুক্ত করার জন্য সংগ্রাম অপরিহার্য।  এই সংগ্রাম সদিচ্ছা, প্রার্থনা বা নৈতিক বক্তৃতার ব্যাপার না। এ হলো সম্পূর্ণভাবে এক কঠিন রাজনৈতিক সংগ্রাম। এ রাজনৈতিক সংগ্রাম ছাড়া অন্য কোন পথে এই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা সৎ লোকের পক্ষে বোকার স্বর্গে বাস করা এবং মন্দলোকের পক্ষে প্রতারণারই নামান্তর।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এমন একটি দেশের মানুষ আমরা, যে দেশ কালে-কালে অনেক দুঃশাসনে শাসিত এবং লুন্ঠিত ও শোষিত বলেই   ঘোষিত। আজীবন বাঙালিরা স্বাধীনতার জন্য জীবনপাত করেই গেলেন, এর সুফল তাঁদের ভাগ্যে কখনো জুটেনি। অলিখিত পরাধীনতার শৃঙ্খল বাঙালিরা ছিঁড়তেই পারলেন না, যাতে মৃত্যু সুখে ও বলতে পারেন যে একটি মাত্র মুহূর্তের জন্যে স্বাধীনতা নামক সোনার হরিণের সাক্ষাৎ তারা পেয়েছে। বাঙালি মেহনতী মানুষ, তারা আজীবন মেহনত করেই কালের গর্ভে বিলীন হয়েছেন।

আজ মনে পড়েছে ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার সরকার এরশাদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-ছাত্রীদের সক্রিয় বিনয়ী ভূমিকার কথা এবং বিজয়ের অন্যতম ছাত্রনেতা এম ইলিয়াস আলীর কথা। বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র আন্দোলনের রয়েছে এক সোনালী অধ্যায়।  সে সঙ্গে ১৯৭১ সালের  মুক্তিযুদ্ধের কথা। তার পরিবর্তে ২০২৪ সালের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কথা। নিজের জন্মভূমিকে যারা বড্ড বেশি ভালোবাসে তারা দেশের জন্য অবুঝ হয়ে ওঠে।  এদের ধৈর্য থাকে না, এরা দ্রুত একটা কিছু করতে চায়। অনেক সময় বিপদের কথা ভুলে যায়। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উপর পুলিশ আনসারের উপর্যুপরি গোলাগুলিতে আবু সাঈদ নামক এক কৃতি সন্তান, পুলিশের হাতে তাক করা বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে বুক পেতে দিয়ে বলেছিলেন “গুলিকর” মুহূর্তের মধ্যে আগ্রাসী পুলিশের বন্দুকের নল থেকে পরপর তিনটি গুলি বের হয়ে আবু সাঈদের তরতাজা বুকটা ভেদ করলো। আবু সাঈদ চোখের পলকের মধ্যেই মাটিতে লুঠিয়ে পড়ে রণাঙ্গনে মৃত্যুবরণ করলেন।আবু সাঈদের মতো অপর এক প্রতিভাবান মেধাবী ছাত্র মীর মুগ্ধ। তিনি বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের মধ্যে হাতে পানি ভর্তি বোতল ও বিস্কুট বিতরণ করছিলেন, এর মধ্যেই পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেছেন। ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনের এক বৈপ্লবিক সাহসী তরুণ যোদ্ধা শরীফ ওসমান হাদীকে দুষ্কৃতিকারীরা হত্যা করেছে, ওসমান হাদী শহীদ হয়েছেন। ওসমান হাদী বলেছিলেন ভারতসহ বিভিন্ন দেশের আধিপত্যকারীর বিরুদ্ধে,তাদের গুপ্তচরেরা এখনো এদেশে বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। দেশের মানুষের স্বার্থে  ওসমান হাদী চেয়েছিলেন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক। পৃথিবীর মানুষ দেখেছেন বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা তাদের তারুণ্য ভরা শক্তি নিয়ে  ঝাঁপিয়ে পড়ে, স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের শৃঙ্খল থেকে বাংলাদেশকে ও বাংলাদেশের স্বাধীন সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছে।  বাংলাদেশ দ্বিতীয়বার স্বাধীন হয়েছে।  শহীদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে শহীদদের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে।

এখানে লক্ষণীয় যে,  ছাত্রনেতা পরবর্তীতে এমপি, এম ইলিয়াস আলী আজ আমাদের মধ্যে নেই। ইলিয়াস আলীর মতো উদার প্রাণখোলা মানুষগুলো যেনো একে-একে হারিয়ে যাচ্ছেন। সিলেট মুরারী চাঁদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে সায়েন্স বিভাগে ইন্টারমিডিয়েটে যখন ভর্তি হলাম, তখন ক্লাসমেট হিসাবে তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। বালুচরে ফোর্থ ব্লকের হোস্টেলের পাশাপাশি রুমে আমরা দুজন থাকতাম। আমি ছিলাম ৪১৫ নম্বর রুমে, ইলিয়াস আলী ছিলেন ৪১৬ নম্বর রুমে। পরিবার পরিজনহীন হোস্টেল জীবনে আমরা একে-অপরের ছায়া স্বরূপ ছিলাম। তার সাথে সখ্যতা-বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিলো মধুর। সিলেট মুরারীচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের স্মৃতি হৃদয় দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পূর্বেই আমাকে কলেজ ছেড়ে যেতে হয়েছে নানা-নানিদের  সান্নিধ্যে। টিসি নিয়ে নরসিংদি সরকারি কলেজে ভর্তি হলাম। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে ঘনিষ্ঠ, আন্তরিক  ও অন্তরঙ্গ হয়ে উঠি। ততদিনে সে বেপরোয়া ছাত্রনেতা হয়ে ওঠে। তবে রাজনৈতিক জীবনে সে সফল। এক উদার হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। অচেনা- অজানা মানুষের জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করতেন কিছু করার। প্রতিদিন কত মানুষ আসতো তাঁর কাছে। কতজনের কত সমস্যা। মানুষের দুঃখ, কষ্ট, দুর্দশা ও বিপদেও তাঁকে দেখেছি সহানুভূতিশীল হয়ে পড়তে। মানুষের কত আশা রাজনীতিবিদদের কাছে রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁরা কতটুকু পারছেন এই দায়িত্ব পালন করতে? আমার কেন যেন মনে হয়, ইলিয়াস আলীর মধ্যে সংবেদনশীল মন ছিল সজীব। ১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানে অপর একজন নূর হোসেন। তার পেটের উপরে বড়-বড় অক্ষরে লেখা ছিলো “স্বৈরাচার নিপাত যাক” এবং পিঠের মাঝে লেখা ছিলো “গণতন্ত্র মুক্তি পাক” পুলিশ এই লেখা দেখামাত্রই তাকে গুলি করে, পুলিশের গুলিতে তিনি মৃত্যুবরণ করলেন।  মানুষ মাত্রই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষে রাজনীতি শাসিত, স্বকালের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি- প্রভাবিত যা এম ইলিয়াস আলী, আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধ, শরিফ ওসমান হাদী,  নূর হোসেন-প্রমুখের চেতনাকেও করেছে আলোড়িত ও স্পন্দিত।

এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখকের দরকার যে, সংগ্রাম করে রক্ত দিয়ে জীবন দিয়ে ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। পরাধীনতার ঘানি টানতে টানতে যখন ধৈর্য সহ্যের বাঁধ মানে না তখনই মানুষ নিজস্ব অধিকার আদায়ের সচেষ্ট হয়। সোচ্চার হয়ে ওঠে দাবি আদায়ের আর তখনই নির্যাতিতরা সংগ্রামের পথ বেছে নেয়। আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়েছি। কখনো দাবি আদায়ের জন্য সংগ্রাম করেছি; কখনও বা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছি। যখন দেখেছি আর দরজা নয় এবার আঘাত করতে হয় তখনই মরিয়া হয়ে সংগ্রামে-স্লোগানে, জীবন দিয়ে অধিকার আদায়ের নিয়োজিত হয়ে বিজয়ী হয়েছি। বাঙালি জাতি অধিকারের জন্য সংগ্রামের জন্য বিজয়ের জন্য জীবন দিতে কখনও পরোয়া করেনি। ১৯৪৭ সাল থেকেই বাঙ্গালীদের মাঝে পরাধীনতা থেকে মুক্তির আলো দেখতে থাকে। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান নামক একটি দেশের সৃষ্টি হয়।  পাকিস্তান দুটি অংশে বিভক্ত ছিল। পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান।  আমরা ছিলাম পূর্ব পাকিস্তান। আমরা ছিলাম শোষিত ভাগে আর ওরা ছিল শোষকের ভাগে। শেষ পর্যন্ত দেশ শাসন করতে গিয়ে আমাদের রক্ত চুষে নিয়ে এমন কি আমাদের বাংলা ভাষাকেও বিলীন করতে চেয়েছিল।  ছাত্র-জনতার দাবির মুখে বরকত, জব্বার, সালাম প্রমুখের রক্তে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হলেও উর্দু ভাষার পরিবর্তে বাংলা ভাষাকে এদেশের ছাত্র জনতা ছিনিয়ে নিয়ে আসেন ১৯৫২ সালে, এভাবেই আমাদের সংগ্রাম চলতে থাকে।

এখানে সর্বজন স্বীকৃত যে তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবন যে দলের মাধ্যমে শুরু সেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ জিয়াউর রহমান। তারেক রহমানের স্নেহময়ী মা, বেগম খালেদা জিয়া তৃতীয় বারের মতো এদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। মেজর জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী নেতা অনেকের চোখেই তিনি ছিলেন বাংলাদেশীর জাতিসত্তার নেতা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর পশ্চিম পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর আক্রমণে বাঙালি জাতি যখন দিশেহারা হয়ে পড়ে। দেশবাসী হঠাৎ শুনতে পেলেন একটি আশার বাণী। তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান, অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে বললেন, “আই রিভোল্ড” “আমি বিদ্রোহ করলাম”। চট্টগ্রামের বিপ্লবী বেতার থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করলেন,  সে ঘোষণা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিলো। একজন বীর সৈনিক মেজর জিয়াউর রহমান যিনি নয় মাস যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধ করে পশ্চিম পাকিস্তানিদের কাছ থেকে বাংলাদেশের বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন, সেই বীর মুক্তিযোদ্ধার গর্বে, বাঙালির বুক ভরে উঠেছিলো। ইংল্যান্ড প্রবাসে দীর্ঘ ১৭ বছর থাকা অবস্থায় স্বদেশের কথা ভুলে থাকতে পারেননি, জিয়াউর রহমানের তনয় তারেক রহমান। তিনি তার পিতার উত্তরসূরী হিসেবে দেশ ও জাতির মধ্যে ফিরে এলেন। তার রাজনীতির উৎস যেহেতু বাংলাদেশ, তাই তাঁর জনক জিয়াউর রহমানের প্রিয় রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভার নিলেন এবং শক্ত হাতে হাল ধরলেন। এদেশ ও জনগণের কল্যাণের জন্যে নিজেকে উৎসর্গ করে গর্বিত বোধ করছেন। বাংলাদেশের বংশোদ্ভুত বাঙালি তিনি তার মুখের ভাষা বাংলা আর তাই বাঙালি বাঙালি বাঙালিত্ব যাতে নষ্ট না হয়, বাঙালির মুখের ভাষা যাতে কেউ কেড়ে নিতে না পারে, সেজন্যেই বাংলা গাঁথা মাতৃভাষার টানে মাতৃভূমিতে ফিরে এসেছেন। পৃথিবীর নানান প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিতে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। এগুতে হবে, বেঁচে থাকার জন্য, তবু জেগে ওঠতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। প্রথম বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ/ জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ/ বাংলাদেশ… বাংলাদেশ।  এ গানটির মুগ্ধ স্রোতা, বীর মুক্তি যোদ্ধা মরহুম-শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাহেবের বিধ্বস্ত বাংলাদেশের  পুণর্গঠনের জন্য  প্রচার করা হোক।

এখানে বলা বোধ করি অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর আমি ও ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (পূর্বে ছিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ) কেমেস্ট্রি অনার্স ভর্তি হলাম। তখনকার ছাত্র সংসদের ভিপি সাগির আহমেদ ও সেক্রেটারি আব্দুল হালিম, তাদের সহযোগিতায় পঠুয়াটুলী (ঘিপটু) অবস্থিত শহীদ আজমল হোসেন ছাত্রাবাসী ৯ নং রুমে একটা সিট পেলাম। একদিন সহপাঠী মশিউল্লাহ পারভেজ মনু আমাকে বলল, সাগীর- হালিমভাই তোমাকে নেবার জন্য আমাকে পাঠিয়েছেন। বললাম-কোথায়?  সে বলল, বর্ধিত সভায়? বললাম, সে আবার কী? বলল, অতকথা বলার সময় নেই, তুমি চলোতো। ওরা অপেক্ষায় আছেন। আমরা সবাই মিলেমিশে চললাম। তবে কোন রাজনৈতিক দলের বর্ধিত সভায় আমি এই প্রথম যাচ্ছি। বেবিট্যাক্সি যখন কাকরাইল উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল পেরিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাসার সামনে এলো, ওরা থামতে বললেন।

দুই-দশ পা হাঁটার পরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘরের বারান্দায় এসে পৌঁছলাম।  মেঝেতে মাদুর পেতে তার উপর ধবধবে সাদা বিছানা চাদর বিছিয়ে বিভিন্ন কলেজ ইউনিভার্সিটির ছাত্র নেতারা ও বসে আছেন। অদম্য কৌতূহলে আমি ও তাঁদের সঙ্গে বসে থাকলাম। কিছুক্ষণ পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাহেব এলেন। আমরা সবাই দাঁড়িয়ে তাকে সালাম ও অভ্যর্থনা জানিয়ে, তাঁকে ঘিরে আমরা সবাই বসলাম। তিনি দাঁড়িয়ে পার্টির এজেন্ডা অর্থাৎ কর্মসূচি ঘোষণা করলেন। প্রত্যেক মাসে একবার করে বর্ধিত সভা হতো। আমি তাঁর একান্ত কাছে বসে, ইচ্ছা করেই তার পায়ের কাছে বসে থেকে মনোযোগ দিয়ে তার বক্তব্য শোনতাম। আর ভাবতাম আমার ভাগ্য ভালো যে,  বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টকে কাছে থেকে দেখেছি। তার পায়ের আঙ্গুল থেকে মাথার চুল পর্যন্ত মুখস্ত-ঠোঁটস্ত রেখেছি। সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি অনেক কথাই বলেছিলেন, তাঁর একটি কথা এখনো ভুলতে পারিনি। তোমাদের যখন যা প্রয়োজন, আমাকে বলতে, আমি আমার সাধ্যমত আপ্রাণ চেষ্টা করব। আমরা খুশি হয়ে চলে এলাম। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাহেব আজ আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তাঁর কথা ও কাজ বেঁচে আছে।  থাকবেও হয়তো আরো দীর্ঘদিন। তারেক রহমানকে দেখে, সেই সঙ্গে মনে ভেসে ওঠে সে সব স্মৃতি। “Like father, like son”.

এখানে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় যে, বুক ভরা হাহাকার, হৃদয় ভরা স্মৃতির যন্ত্রণা এবং সর্বশেষ যে কোন মুহূর্তে উড়ে যেতে পারে পিতার মতো এই ভালোবাসার প্রাণ, একথা জেনেও দেশে আসলেন ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা নিয়ে। লৌহ মানব নয়, যেন তার চেয়ে কঠিন একটা কিছু। বাংলার মানুষের পাশে থেকে মুক্তির সংগ্রামে অংশ নেওয়ার জন্য তিনি দেশে এসেছেন। স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি দেশে এসেছেন শুধু নেতৃত্ব শুন্য বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনগুলোর শুধু প্রাণ সঞ্চারের জন্য নয়, লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এ স্বাধীনতা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাহেবের অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করার জন্যই তিনি দেশে ফিরে এসেছেন। এমন চৈতন্য চাই যা আমাদের গঠিত সভ্যতার উত্তরসূরী হিসেবে আমাদের সঠিক স্থান লাভ করতে সাহায্য করবে। যদি এই অপরাজেয় চৈতন্য জাগ্রত হয় তাহলে কোন কিছুই আমাদের সঠিক ভবিষ্যৎ অর্জনে প্রতিরোধ করতে পারবে না। আমরা এখন চালক শক্তি পেয়ে গেছি যেই চালক শক্তি সদা হাসি খুশি সদালাপী সুন্দর মনের মানুষ জনাব তারেক রহমান।  তিনি আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বি এন পি) পক্ষ থেকে এমপি প্রার্থী।  তাঁর  বিএনপি  সরকার গঠিত হলে,  সিলেট তথা সমগ্রদেশবাসী গর্ববোধ করবেন।  আমার মতো বৈকলম লেখকের রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক কৌশল কাউকে মেনে নিতে হবে না। আমার লেখক সত্তা নিশ্চয়ই রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে লেখার কারণে মুছে যেতে পারে না। আমি আমার দেশের রাজনৈতিকের প্রতি খোলামেলা অভিমত ব্যক্ত করেছি। আমি যখন লিখি তখন আমি শুধুই একজন লেখক, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ একজন মানুষ। দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ সিলেট। ৩৬০ আউলিয়ার পূণ্যভূমি। হযরত শাহজালাল আউলিয়া মোজার্দেদী (রহঃ) ও হযরত শাহপরাণ (রহঃ) এর পবিত্র মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে সিলেট থেকে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণ শুরু করেন। দূর দূরান্ত থেকে দলে দলে সিলেট আলিয়া মাদ্রাসার বিশাল প্রাঙ্গনে নির্বাচনী  সমাবেশে লোকজন আসতে শুরু করেন। বেশ উঁচু মঞ্চ নির্মাণ করা হয়েছে শহরের বিভিন্ন জায়গায় “তারেক রহমানের আগমন-শুভেচ্ছা স্বাগতম”  কোথাও কোথাও আবার “দুলাভাইয়ের আগমন-শুভেচ্ছা স্বাগতম”  লেখা ব্যানারে ব্যানারে চেয়ে গেছে। অসংখ্য তোরণ নির্মিত হয়েছে। সিলেট কে শুধু কৃত্রিমতা দিয়ে সৌন্দর্য বাড়ানো যাবে না। “দুলাভাইয়ের আগমন-শুভেচ্ছা স্বাগতম” নগরীর অলি-গলিতে, সিলাম-গহরপুরের প্রবেশ পথে সত্য-সুন্দর সেইলেখার বাস্তবতা কবে ফুটে ওঠবে সিলেটবাসী বুক ভরা আশা নিয়ে তার প্রতীক্ষায় আছে। ভালো মন- মানসিকতার মানুষ তারেক রহমানের কাছে সিলেটবাসীর দাবি, সমাজের অবস্থার উন্নতির জন্য মানবিক কারণেই উচিত সম্ভাব্য সবকিছু করা। তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের সারা পথের কাঁকর আড়াল করে যেন বিছানো আছে মায়ের আঁচল, সারা বাতাসে যেন মায়ের মঙ্গলময় আহ্বান।  চোখের সামনে তাঁর অহর্নিশি ভাসছে দুটি চোখ-মায়ের স্নিগ্ধ গভীর উজ্জ্বল চোখ ধ্রুব তারার মত। পথ চলতে তারেক রহমানের ভুল হয় না, পথের আঘাত তাঁর পায়ে লাগে না। আজ পর্যন্ত যে দেশে যে জাতিই জেগেছে, তার সে জাগার পেছনে উত্তেজনা ও অনুপ্রেরণা দেবার জন্যে  জ্বলন্ত ইতিহাস রয়েছে, যে জাতির ছিলনা, সে জাতি কাব্য ও কাহিনী রচনা করিয়ে তার সাহায্যে জেগেছে। আমাদের অতি উজ্জ্বল, অতি অদ্ভুত  ইতিহাস আছে, শুধু চোখের সামনে সে ইতিহাস মেলে ধরতে হবে, প্রাণে-প্রাণে অন্তরে-অন্তরে আমাদেরকে জানতে হবে, অনুভব করতে হবে।

পরিশেষে বলা আবশ্যক যে, দুলাভাই আর বুবাইর পৈত্রিক নিবাস বগুড়া ও সিলেট। অনেক দূরের পথ। শহরে নবাগত কোন যাত্রী যেমন নিজেকে হারিয়ে ফেলেন, এমনই তাঁকে দেখে মনে হয়েছে সিলেটে অতি আপনজনদের সান্নিধ্যে, শালা-শালীদের পরম উষ্ণতার স্পর্শে একজন  নবাগতবর শ্বশুরালয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন। মঞ্চে উপস্থিত দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তাঁর স্ত্রী ডাক্তার জোবায়দা রহমান, দীর্ঘদিন পর এই মানানসই দম্পতির সঙ্গে দেখা হলো সিলেটবাসীর। বলাচলে একই বৃত্তে দুটিফুল। প্রাণের উৎস থেকেই তাঁদের ভালোবাসার সম্পর্ক। তাদেরকে দেখে মানুষের মধ্যে তীব্র ব্যাকুলতার সৃষ্টি হয়েছে।  আনন্দ-উৎফুল্ল, উদ্দীপনা, উল্লাস উত্তেজনায় স্থানটি সরগরম হয়ে ওঠে। আজ এদেশের মানুষ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সভায় ঐক্যবদ্ধ থাকেন আর নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারেন তাহলে শহীদগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে এবং আংশিকভাবে হলেও তাঁদের রক্তের ঋণ শোধ হবে।

লেখক : কবি ও কলামিস্ট

মিশিগান – আমেরিকা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Lorem Ipsum has been the industry's standard dummy text ever since the 1500s.