শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ০১:২০ পূর্বাহ্ন

সাংবাদিকতার কালো দিবস: বাকস্বাধীনতার কণ্ঠরোধের এক শোকাবহ অধ্যায়

নুরজাহান নুরী

আজ ১৬ জুন—বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ইতিহাসে এক শোকাবহ দিন, ‘সাংবাদিকতার কালো দিবস’।

১৯৭৫ সালের এই দিনে স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় দেশের সব স্বাধীন পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রীয়ভাবে সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করে দেওয়া হয়েছিল গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার।

সেই কালো অধ্যায়ের সূচনা ঘটে যখন ১৯৭৫ সালের ১৫ জুন রাতের পর ১৬ জুন থেকে কার্যকর হয় সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা। দেশের মাত্র চারটি পত্রিকা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে রেখে বাকি সব দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা এক আদেশে বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ হয়ে যায় ‘দৈনিক ইত্তেফাক’, ‘দৈনিক সংবাদের’ মতো জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী সংবাদপত্র। এর ফলে হাজার হাজার সাংবাদিক, কলামিস্ট, ছাপাখানার শ্রমিক ও মিডিয়া কর্মী একদিনেই বেকার হয়ে পড়েন। হারিয়ে যায় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের ন্যূনতম নৈতিক অধিকার।

সাংবাদিকতার ওপর এই নিষ্ঠুর আঘাত শুধু একটি পেশাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, এটি ছিল গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করার একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। সংবাদমাধ্যম ছিল সরকারের চোখে কাঁটা, কারণ তারা প্রশ্ন তুলছিল, প্রতিবাদ করছিল, এবং সাধারণ মানুষের পক্ষ হয়ে কথা বলছিল। স্বাধীনতা অর্জনের এত অল্প সময় পরেই যখন দেশের নাগরিকদের মতপ্রকাশের অধিকার হরণ করা হয়, তখন সেটি শুধু রাজনৈতিক সংকট নয়, এটি ছিল নৈতিক বিপর্যয়ও।

এই কালো দিনের প্রতি বছর ফিরে আসা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাংবাদিকতা কোনো অপরাধ নয়—বরং এটি রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সমাজের দিকনির্দেশনা দেয়। যারা সত্য প্রকাশে কাজ করেন, তাদের কণ্ঠরোধ মানেই জনগণকে অন্ধকারে রাখা। আর এই অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর প্রতীক হয়ে প্রতিটি সাংবাদিক, সম্পাদক ও গণমাধ্যম কর্মীকে দাঁড়াতে হয়।

আজকের এই দিনে আমাদের প্রয়োজন সত্য, সাহস ও সততার সঙ্গে কাজ করে যাওয়ার অঙ্গীকার। ভুলে যাওয়া যাবে না ইতিহাস, কিন্তু শেখা উচিত ইতিহাস থেকে—যাতে কোনো শাসক আর কখনো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার সাহস না পায়।

সাংবাদিকতার কালো দিবসে আমরা শ্রদ্ধা জানাই সেইসব সাংবাদিকদের, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও মানুষের কথা বলার অধিকারকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। এই দিনে নতুন করে প্রতিজ্ঞা করি—স্বাধীন সাংবাদিকতা থেমে থাকবে না, কোনো কালো অধ্যায়ই তা রোধ করতে পারবে না।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Lorem Ipsum has been the industry's standard dummy text ever since the 1500s.