শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৫ পূর্বাহ্ন

পারমাণবিক যুদ্ধ কি খুব শিগগিরই শুরু হচ্ছে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

 

স্নায়ুযুদ্ধের সেই চরম উত্তেজনার দিনগুলোতে বিশ্বজুড়ে যেভাবে যুদ্ধের আতঙ্ক ছড়িয়েছিল, আধুনিক বিশ্ব যেন আবারও সেই একই খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে।

গত সপ্তাহেই আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়াদ শেষ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত সর্বশেষ পরমাণু নিয়ন্ত্রণ চুক্তি নিউ স্টার্ট-এর। আর এই চুক্তির অবসান বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর অনিশ্চয়তা ও নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার শঙ্কা তৈরি করেছে।

২০১০ সালে স্বাক্ষরিত এই ঐতিহাসিক চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল দুই পরাশক্তির মোতায়েন করা পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা ১৫৫০টির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা। ২০২১ সালে জো বাইডেন প্রশাসন বিশেষ বিবেচনায় এর মেয়াদ পাঁচ বছর বৃদ্ধি করলেও বর্তমানে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং আইনি জটিলতার কারণে নতুন কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার হাতে বিশ্বের মোট পারমাণবিক অস্ত্রের প্রায় ৯০ শতাংশ মজুদ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত থাকলেও এখন কোনো কার্যকর চুক্তি না থাকায় দেশ দুটি তাদের ইচ্ছেমতো পারমাণবিক শক্তি বৃদ্ধির পথ খুঁজে পেয়েছে। বিশেষ করে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থান এবং রাশিয়ার নতুন করে আলোচনার অনাগ্রহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

মস্কো অনানুষ্ঠানিকভাবে চুক্তির সীমাবদ্ধতা মেনে চলার প্রস্তাব দিলেও ওয়াশিংটন তা নাকচ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, কেবল রাশিয়ার সাথে চুক্তি করলেই হবে না বরং উদীয়মান শক্তি হিসেবে চীনকেও এই পরমাণু নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।

চীনের পারমাণবিক সক্ষমতা বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০৩৫ সালের মধ্যে বেইজিংয়ের হাতে অন্তত ১৫০০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড থাকতে পারে। ওয়াশিংটন মনে করছে, কেবল রাশিয়ার সাথে অস্ত্র সীমিত করার চুক্তি করলে তারা চীনের তুলনায় পিছিয়ে পড়বে। অন্যদিকে, চীন নিজেদের একটি বড় বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় এবং তারা এই মুহূর্তে কোনো নিয়ন্ত্রণ চুক্তিতে অংশ নিতে নারাজ।

এই পরিস্থিতিতে রাশিয়াও বেইজিংয়ের পক্ষ নিয়ে দাবি করছে, যদি আলোচনা বহুপাক্ষিক করতে হয়, তবে ন্যাটোর সদস্য হিসেবে ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারকেও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। ফ্রান্স ও ব্রিটেন অবশ্য নিজেদের পরমাণু কর্মসূচি কোনো চুক্তির অধীনে আনতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের পাশাপাশি এখন আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য ছোট আকারের পারমাণবিক অস্ত্র। রাশিয়ার পক্ষ থেকে বেলারুশে এ ধরনের অস্ত্র মোতায়েন ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বড় ধরনের যুদ্ধের বদলে এখন ছোট ও বিধ্বংসী অস্ত্রগুলোর ব্যবহারের সম্ভাবনা বেড়েছে। অন্যদিকে, পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার আধুনিকায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় মস্কো ও ওয়াশিংটন উভয় পক্ষই অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। রাশিয়ার জন্য পারমাণবিক শক্তি এখন বিশ্বমঞ্চে তাদের বড় শক্তি হিসেবে টিকে থাকার একমাত্র প্রধান মাধ্যম।

বর্তমান এই অচলাবস্থার ফলে ইউরোপের দেশগুলো চরম নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে ইউরোপের প্রতিরক্ষায় মার্কিন প্রতিশ্রুতি কমে আসার যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যকে তাদের নিজস্ব পরমাণু সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা ভাবতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, যদি পরাশক্তিগুলো শিগগিরই আলোচনার টেবিলে না ফেরে এবং কেবল নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াইয়ে লিপ্ত থাকে, তবে বিশ্ব এক অনিয়ন্ত্রিত এবং বিপজ্জনক পারমাণবিক প্রতিযোগিতার যুগে প্রবেশ করবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Lorem Ipsum has been the industry's standard dummy text ever since the 1500s.