বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন

নৌকায় সবার আগে মারা যান মহিবুর, তবু দুই দিন গোপন রাখেন দালাল

নিউজ ডেস্ক
ছবি : সংগৃহীত

 

মহিবুর রহমানের (২০) লাশ যখন সাগরে, তখন দালাল নবী হোসেন দেশে তাঁর পরিবারকে বলেন, তিনি গ্রিসে পৌঁছেছেন, ক্যাম্পে আছেন। লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকায় মারা যাওয়া মহিবুর রহমানের মৃত্যুর খবরটি দুই দিন চেপে রাখেন দালাল।

সুনামগঞ্জের ১২ জনের মৃত্যুর খবর জেনে পরিবার যখন অস্থির, তখনো মহিবুর বেঁচে আছেন বলে তাঁদের নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়।

রাবারের বোটে (নৌযান) করে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের ১২ জনের মৃত্যুর খবর দেশে তাঁদের স্বজনদের কাছে আসে গত ২৮ মার্চ বিকেলে। কিন্তু মহিবুর রহমানের পরিবার এর দুই দিন পর ৩০ মার্চ (সোমবার) খবর পায় যে তিনি মারা গেছেন। এর আগে বারবার দালাল নবী হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তাঁর বাড়িতে গিয়েও নিশ্চিত হতে পারেনি পরিবার।

মহিবুর রহমানের বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ভাতগাঁও ইউনিয়নের গাগলাজুর গ্রামে। তাঁর বাবা মো. নুরুল আমিন, মা মহিমা বেগম। তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে মহিবুর ছিলেন সবার বড়। দেশে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। তাঁর আয়েই চলত পুরো সংসার।

মহিবুরের চাচাতো ভাই ভাতগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য মোহাম্মদ সুনু মিয়া জানান, মহিবুর চার মাস আগে গ্রিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন। এরপর সৌদি আরব হয়ে লিবিয়ায় যান। মাঝখানে তিনি খুব কষ্টে আছেন জানিয়ে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানিয়েছিলেন পরিবারের কাছে। সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা এলাকার নবী হোসেনের মাধ্যমে তিনি গ্রিসে যেতে চেয়েছিলেন। নবী হোসেন লিবিয়ায় আছেন। ছেলেকে গ্রিসে পাঠাতে দরিদ্র নুরুল আমিন জমি বিক্রি করেছেন, মহাজনি সুদে এনে ১৩ লাখ টাকা দিয়েছেন।

মহিবুরের স্বজনেরা বলেন, গত শনিবার ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারানো সুনামগঞ্জের ১২ জনের খবর দেশে আসার পর থেকেই মহিবুরের পরিবার দালাল নবী হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

নবী হোসেন বলেন, তিনি পরে জানাবেন। পরে জানান, মহিবুর গ্রিসে আছেন। নবী হোসেনের কথায় সন্দেহ হলে মহিবুরের পরিবার যায় নবীর বাড়ি পাগলা এলাকায়। সেখান থেকে সুনু মিয়া নিজে মুঠোফোনে কথা বলেন নবী হোসেনের সঙ্গে। তখন নবী হোসেন নিশ্চিত করেন যে মহিবুরকে ওই নৌকায় তুলে দেওয়া হয়েছিল। তখনো তিনি মহিবুরের মৃত্যুর বিষয়টি এড়িয়ে যান।

এরপর ওই নৌকা থেকে জীবিত উদ্ধার হওয়া জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের সাদীপুর গ্রামের তরুণ মারুফ আহমদ দেশে ফোন করে জানান, নৌকায় সবার আগে মৃত্যু হয় মহিবুরের। পরে অন্যদের সঙ্গে তাঁর লাশটি ভাসিয়ে দেওয়া হয় সাগরে। দেশ থেকে মহিবুর ও মারুফ একসঙ্গেই গিয়েছিলেন। তাঁরা সৌদি আরবে ও লিবিয়ায় একসঙ্গে ছিলেন।

মহিবুরের মামাতো ভাই একই গ্রামের বাসিন্দা সিব্বির আহমদ বলেন, ‘আমরা বারবার যোগাযোগ করার পরও দালাল নবী হোসেন বলে, মহিবুর নাকি গ্রিসে পৌঁছে গেছে। ক্যাম্পে আছে, এখন কথা বলা যাবে না। এভাবে টালবাহানা করে দুই দিন পার করা হয়। আমরা তো অস্থির। দুই দিন পর জানতে পারি, আমার ভাই আর নাই।’

লিবিয়া থেকে রাবারের বোটটি (নৌযান) ২১ মার্চ গ্রিসের উদ্দেশে যাত্রা করার পর ভূমধ্যসাগরে পথ হারিয়ে ফেলে। সাগরে বোটটি ছিল ছয় দিন। এ সময় জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনাহারে একে একে বোটের ২২ জন মারা যান। তাঁদের বেশির ভাগই সুনামগঞ্জের। দুই দিন লাশগুলো বোটেই ছিল। একপর্যায়ে লাশ থেকে দুর্গন্ধ বের হলে দালালের নির্দেশে সেগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। ২৭ মার্চ শুক্রবার গ্রিসের উপকূলে ওই নৌকায় থাকা অন্যদের উদ্ধারের পর মৃত্যুর বিষয়টি জানাজানি হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Lorem Ipsum has been the industry's standard dummy text ever since the 1500s.