
সিলেট নগরীকে আগাম বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা করতে সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। এই প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে সুরমা নদীর সংযোগস্থলে জলকপাট বা স্লুইস গেট নির্মাণ, পাড় উঁচু করা ও পাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (২ মে) সিলেট সফরে এসে এই প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরীর বন্যা নিয়ন্ত্রণে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিস্টদের।
একদিকে নদী, আরেকদিকে টিলার বেষ্টনী। এমন ভৌগোলিক কাঠামোর সিলেট নগরীর ভেতরে রয়েছে ১৩টি প্রাকৃতিক ছড়া (প্রাকৃতিক নালা, খালের মতো)। ছড়াগুলো গিয়ে মিলিত হয়েছে সুরমা নদীতে। বর্ষাকালে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং অতিবৃষ্টি হলে এই ছড়াগুলো দিয়ে পানি সিলেট নগরীতে প্রবেশ করে। যার ফলে সিলেটের বেশকিছু আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও আগাম বন্যা দেখা দেয়। ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের বন্যার অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একাধিক সভা ও সেমিনার হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রখ্যাত পানি বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাতও সিলেট পরিদর্শন করেন।
সিসিকের প্রকৌশল শাখা সূত্রে জানা যায়, বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার প্রজেক্ট প্রস্তাব করা হয়েছে সরকারের কাছে। এখনো এটি আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পায়নি। তবে বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে সরকার প্রজেক্টটি গ্রহণ করেছে। প্রকল্পটির কাজ করাতে সরকার প্রথম ধাপে ৪ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেবে।
জানা গেছে, প্রকল্পটিতে স্লুইস গেট প্রস্তাবনা আছে তিনটি। একটি নগরীর কাজীরবাজার এলাকায় বৈঠাখাল, ছড়ার পাড় এলাকার গোয়ালীছড়া ও বোরহানউদ্দিন এলাকার হলদিছড়া। স্লুইস গেটগুলোর পাশে পাম্প বসানো হবে। নদীর পানি শহরে প্রবেশ না করার জন্য স্লুইস গেট বন্ধ রাখা হবে।
আবার বৃষ্টির পানিতে ছড়া ভরে গেলে সেই পানি নিষ্কাশনের জন্য পাম্প দেওয়া হবে। এ ছাড়া সিলেট তামাবিল বাইপাস রোডের শাহপরান ব্রিজ থেকে বাধাঘাট ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৭ কিলোমিটার নদীর দুই পাড় উঁচু করা হবে। যেখানে পাড় উঁচু করার জায়গা নেই, সেখানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ দেয়াল নির্মাণ করা হবে।
সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবর বলেন, ‘বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতেই এই প্রকল্পের প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকার বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে এটি গ্রহণ করেছে। শিগগিরই এর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন আসবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রকল্পটির কাজ বিদেশি সংস্থার মাধ্যমে করতে হবে। সরকার এটা ডোনারের মাধ্যমে করবে।’
সিসিক প্রকৌশল বিভাগ জানিয়েছে, সিলেটে বন্যা নিয়ন্ত্রণে সুরমা নদী খনন প্রয়োজন। এ বিষয়টি প্রকল্পে নেই। এ ক্ষেত্রে তাদের মত, বন্যা নিয়ন্ত্রণ করার একটা প্রক্রিয়া হলো খনন করে নদীর গভীরতা বাড়িয়ে দেওয়া। সুরমা নদীর খনন প্রয়োজন। কিন্তু হঠাৎ করে নদীর মাঝখানে খনন করে কোনো লাভ নেই। খনন করতে হলে একটি প্রক্রিয়ায় করতে হবে।
সুরমা নদী খনন করতে হলে বাংলাদেশের যে অংশ আছে, অমলশিদ, সেখান থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে একটি লেভেল মেইনটেইন করা দরকার। খননের বালু-মাটি কোথায় রাখা হবে তা নিয়েও ভাবতে হবে। সঠিকভাবে রাখতে না পারলে সেই বালু-মাটি আবার নদীতে আসবে। তাই সুরমা নদী খনন করতে অনেক বিষয় বিবেচনা করার আছে।
এ প্রসঙ্গে সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী বলেন, ‘সুরমা নদী খনন করতে গেলে জাতীয়ভাবে অনেক বড় পরিকল্পনা নিতে হবে। নদী খননের সঙ্গে বেশকিছু বিষয় সংশ্লিষ্ট আছে। খনন করার পর দুই পাড়ের অবস্থা কী হবে, আরও ভাঙন বাড়বে কি না, সেটা বুঝতে হবে। অনেক টেকনিক্যাল বিষয় আছে।
আরও বিশেষজ্ঞ মতামত দরকার আছে। কিন্তু এটা অনেক সময়সাপেক্ষ ও বিশাল কর্মযজ্ঞের ব্যাপার। স্বল্প সময়ে এটা করা যাবে না। আবার একবার বন্যা হলেই কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে যায় আমাদের। তাই সিলেট নগরীকে বন্যা থেকে রক্ষা করতে খনন প্রক্রিয়ায় না গিয়ে এই প্রজেক্ট গ্রহণ করা হয়েছে।’